• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

Advertise your products here

Advertise your products here

কুড়িগ্রামে কৃষকের প্রতিষ্ঠিত ‘উর্বরা বীজ কেন্দ্র’ 


Newsofdhaka24.com ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০৮:২৬ পিএম
উর্বরা বীজ কেন্দ্র

গোলাম রব্বানী, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
মানসম্মত ধান বীজ উৎপাদন ও বিপণনের লক্ষ্যে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার মুশরত নাখেন্দা (কাশেম বাজার) গ্রামের কৃষক প্রতিষ্ঠিত ‘উর্বরা বীজ কেন্দ্র’ -এর বীজ এলাকার কৃষকের নিকট ভালো বীজ হিসেবে আস্থা অর্জন করেছে।
বীজ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ঐ মুশরত নাখেন্দা গ্রামের কৃষক অশি^নী কুমার রায় (৫৭)। এলাকার কৃষকের নিকট তার ধান বীজ জনপ্রিয়তা পাওয়ায়, এখন পাশ^বর্তী জেলায়ও বীজ বিক্রি হচ্ছে। 
অশি^নী কুমার ২০১৬ সালে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত আইএপিপি-এলএফএস (Instigated Agriculture Productivity Project – IAPP & Livelihood Field School – LFS) প্রকল্পের আওতায় ২৫ জন কৃষক গ্রæপে সম্পৃক্ত হয়ে এক বছরব্যাপী বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। মাসে একদিন তত্ত¡ীয় প্রশিক্ষণ আর বাকী দিনগুলো নিজ মাঠে বীজ উৎপাদনের বাস্তব জ্ঞান নিয়েছিলেন। 
ধান বীজ উৎপাদনের ওপর বাস্তব জ্ঞান-দক্ষতা অর্জন করতে ২০১৬ সালে ঐ ২৫ জন একত্রে ১৫ একর জমিতে ব্রি-৫৮ জাতের ধান রোপন করেন। এতে ফলন আসে প্রায় ২১ টন এবং এর মধ্যে বীজ পান প্রায় ১৬ টন, যা এসিআই এবং সুপ্রিম সীড কোম্পানীর নিকট বিক্রি করেন। এতে প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ মুনাফা আসে, যা কৃষক সদস্যরা ভাগ করে নেন। পরের বছর (২০১৭) তাদের ৪/৫ জন কৃষক বীজ উৎপাদন শুরু করলেও পরে অশি^নী বাবু ছাড়া বাকী সবাই বীজ উৎপাদন বন্ধ করে দেন।
অশি^নী বাবু ২০১৬ সালে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বীজ উৎপাদনের জন্য ‘উর্বরা বীজ কেন্দ্র’ নামে নিবন্ধন (রেজিঃ নং-SW/MOA/19428 ও তাং-২৬/০৬/২০১৬ ইং) প্রাপ্ত হন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে গাজীপুরস্থ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে ধান প্রজনন বীজ সংগ্রহ করেন এবং নিজ জমিতে তা বপন করেন। ঐ চারা বীজ নিজ জমিতে লাগিয়ে নিজেই ভিত্তি বীজ উৎপাদন শুরু করেন। 
অশি^নী বাবু জানায়, আমি প্রথম ২০১৬ ও ২০১৭ সালে এলএফএস কৃষক গ্রæপের মাধ্যমে ধান বীজ উৎপাদনে জড়িত ছিলাম। পরবর্তীতে বীজ উৎপাদন সনদ পাওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে নিজেই বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন করে আসছি। আমি ২০১৮ সালে নিজের তিন একর এবং লিজ নেওয়া দুই একর মোট পাঁচ একর জমিতে ধান বীজ উৎপাদন শুরু করি। বীজ ফলন পেয়েছি ছয় টন, খাবার ধান এক টন এবং চিটা ও নন-চিটা অর্ধ টন। খরচ বাদে শুধু বীজ উৎপাদনে লাভ পেয়েছি ৩০ হাজার টাকারও বেশি এবং চিটা দ্বারা নিজ পুকুরে মাছের খাবার তৈরি করেছিলাম। 
অশি^নী বাবু জানান, আমি ২০১৯ সালে লিজ জমিসহ মোট দশ একর জমিতে ধান বীজ উৎপাদন করেছিলাম। শুধু বীজ ধান পেয়েছিলাম ১৯ টন এবং বিক্রয় করেছিলাম ১৪ টন। যেহেতু আমি উৎপাদিত বীজ ছত্রাকনাশক কিংবা কিটনাষক ছাড়াই প্যাকেটজাত করি, তাই বাকি বীজ খাবার ধান হিসেবে বিক্রি করেছিলাম। 
বীজ উৎপাদনের জন্য জমি তৈরি, প্রজনন বীজ ক্রয়, কৃষি শ্রমিক, ধান কাটা-মারাই, শুকানো, গ্রেডিং করা, বীজের জন্য প্যাকেট ক্রয়, সংরক্ষণ ইত্যাদি বাবদ মোট খরচ হয়েছিল ৩,২৭,৯০০ টাকা। বীজ ও অবীজ ধান একত্রে বিক্রি করেছিলাম মোট ৪,৭৫,০০০ টাকা। মোট মুনাফা এসেছিল ১,৫২,৪০০ টাকা।
আমি গত বোরো মৌসুমে ১০ একর জমিতে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৫৮, ব্রি-৮৬ ও ব্রি-৮৯ জাতের ধান বীজ করেছিলাম। এতে বীজ (সীড) ধান পেয়েছিলাম সাড়ে ১৫ টন এবং অবীজ (নন-সীড) ধান পেয়েছিলাম তিন টন। সীড এবং নন-সীড ধান বিক্রি করেছিলাম ৭,২৫,০০০ টাকা, যেখানে জমি তৈরি থেকে বীজ ডিলারের নিকট পৌঁছা পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৪,০০,০০০ টাকা। লাভ হয়েছে ৩,২৫,০০০ টাকা কিন্তু এর মধ্যে মাঠ পর্যায়ে বাকী পরে আছে প্রায় ১,২৫,০০০ টাকা। 
তিনি জানান, সাধারনত বীজের চারটা শ্রেণী আছে। গুনগত মান অনুযায়ী যা হলো - প্রজনন বীজ, ভিত্তি বীজ, প্রত্যায়িত বীজ এবং মানঘোষিত বীজ। যদিও আমার উৎপাদিত বীজ ভিত্তি বীজ, কিন্তু সরকারীভাবে বীজের গ্রেডিং খরচ বাঁচাতে আমার প্যাকেটজাত বীজকে ‘মানঘোষিত বীজ’ হিসেবে বিক্রি করে আসছি। আমার ধান বীজ কুড়িগ্রাম জেলা ছাড়াও পাশ^বর্তী লারমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার কৃষকরা কিনেছিল।  
রাজারহাট বাজারের বীজ বিক্রেতা (ডিলার) মোঃ নূরুজ্জামান (৪৫) জানান, অশি^নী বাবুর উর্বরা বীজ কেন্দ্রের ধান বীজ তুলোনামুলক খুব ভালো। গত আমন মৌসুমে তিনটি জাতের প্রায় চার টন বীজ বিক্রি করেছিলাম। আমি উর্বরা বীজ কিনেছিলাম প্রতি প্যাকেট (দুই কেজির) ৫০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা আর ঐ প্রতি প্যাকেট বিক্রি করেছিলাম ১১০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা। যেখানে অন্য কোম্পানীর বীজ বিক্রি করেছিলাম (প্রতি প্যাকেট দুই কেজিু হিসেবে) প্রতি কেজি ১৪০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা। এলাকার কৃষকের নিকট শুনেছি উর্বরা কোম্পানীর ধান বীজ ভালো এবং এর প্রায় সব বীজ অঙ্কুরিদ্গম হয়েছিল।
উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণী ইউনিয়নের চৌমোহনী বাজারে ধান বীজ বিক্রেতা ও কৃষক জাভেদ আলী (৫৫) জানায়, রাজারহাট উপজেলার অশি^নী বাবুর উর্বরা ধান বীজ খুব ভালো। আমি নিজেও অশি^নী বাবুর ধান বীজ রোপণ করেছিলাম এবং দেখেছি প্রায় শতভাগ বীজ অঙ্কুরিদগম হয়েছিল।   
গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের চীফ ইন্সট্রাকটর ষষ্ঠি চন্দ্র রায় জানান, আমি যখন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছিলাম, তখন আমি ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের মুশরত নাখেন্দা গ্রামের কিছু কৃষককে ধান বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করি এবং কিছু কৃষককে বছরব্যাপী প্রশিক্ষন প্রদান করি। বীজ বিক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী অশি^নী বাবু বীজ সরবরাহ দিতে পারতেন না। যেহেতু, উনি নিজে অল্প পরিমানে বীজ উৎপাদন করতেন। 
আমি দেখেছি, অশি^নী বাবুর ধান বীজের মান খুবই ভালো। তিনি মূলতঃ ধানের প্রজনন বীজ গাজীপুর ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করেন। ফলে তার উৎপাদিত বীজ ভিত্তি বীজের সমতুল্য। আমি রাজারহাট, ফুলবাড়ী, উলিপুর, চিলমারী, কুড়িগ্রাম সদর ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার অনেক কৃষককে তার ধান বীজ ক্রয়ের পরামর্শ দিয়েছি। তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি মনে করি, প্রতি উপজেলায় কৃষক পর্যয়ে এ ধরনের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি জানা দরকার। 

Newsofdhaka24.com / নিজস্ব প্রতিবেদক

সারাদেশ বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ